নির্বাচন নিয়ে যে বিশেষ কৌশলে জামায়াত

নির্বাচন নিয়ে যে  বিশেষ কৌশলে জামায়াত

জামায়াতে ইসলামীর ঘাঁটি বলা হয় চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) ও চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনকে। এখানে আওয়ামী লীগ আমলেও নির্বাচন করে দলটির বেশ কয়েকজন এমপি হয়েছেন। এ দুটিসহ ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জেলায় অন্তত আটটি আসন টার্গেট করেছে জামায়াত। এখানে ভোটার তালিকা হালনাগাদে দলটির নেতাকর্মীর তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। জামায়াতের পরিকল্পনায় থাকা আসনে নতুন ভোটারের আবেদনের হারকে ‘অস্বাভাবিক’ বলা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কর্মী-সমর্থকদের ভোটার করতে জামায়াত তিন কৌশল নিয়েছে। লোহাগাড়ার প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের সামনে ক্যাম্প করেছে। ৯ সদস্যের যুব কমিটি এসব ক্যাম্পে ল্যাপটপ ও প্রিন্টার নিয়ে সব ধরনের সহযোগিতা করেছে। আবার ক্যাম্প না করলেও কোনো কোনো উপজেলায় দলটির অঙ্গসংগঠনের নেতারা তথ্য সংগ্রহকারীকে নজরদারিতে রাখেন। তারা অন্যান্য দলের সমর্থকদের তুলনায় ভোটার তালিকায় নিজেদের লোককে বেশি করে রাখার বিষয় নিশ্চিত করেন। আরেক গ্রুপ ঠিকানা পরিবর্তন করছে। 

এতদিন অন্য এলাকার ভোটার থাকলেও এখন নিজ এলাকায় ভোট দিতে চাচ্ছেন তারা। এ প্রবণতা বেশি বিএনপি-জামায়াত অধ্যুষিত আট উপজেলায়। 

তবে কিছু এলাকায় নতুন ভোটারের বেশি আবেদন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি। দলটির নেতাদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই জামায়াত তাদের কর্মী-সমর্থকদের ভোটার করতে চাচ্ছে। এ জন্য মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ কর্মকর্তাকেও চাপ দিয়েছে। পরে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে নির্বাচন কমিশন ‘নতুন ভোটার যাচাই-বাছাই বিশেষ কমিটি’ করেছে। কমিটির প্রধান স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সদস্য সচিব উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা বিষয়টি দেখে ইসিতে প্রতিবেদন দেবেন।

জানতে চাইলে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা বশির আহমেদ বলেন, ‘চট্টগ্রামের কয়েকটি এলাকায় বেশি আবেদন পড়ায় ফরমে কোনো অসংগতি আছে কিনা, কাগজপত্র সঠিক আছে কিনা যাচাইয়ে বিশেষ কমিটি করা হয়েছে। কারও বিরুদ্ধে কোনো অসংগতি পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নতুন ভোটারের সর্বোচ্চ আবেদন পড়েছে বাঁশখালীতে। উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা হারুন মোল্লা বলেন, ‘কথা ওঠায় কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করেছি।’ বাঁশখালীর ইউএনও জামশেদুল আলম বলেন, ‘ইসির নির্দেশনা অনুযায়ী যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কাজ শেষ হলে কমিশনকে বিস্তারিত জানানো হবে।’

বাঁশখালী থেকে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী প্রয়াত জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর ছেলে মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা বলেন, ‘জামায়াত বিশেষ মিশন নিয়ে কাজ করলেও নতুন ভোটারদের ব্যাপারে আমাদের তেমন পরিকল্পনা নেই। নির্বাচন কমিশন যাকে যোগ্য মনে করবে, তাকে ভোটার করুক।’

বেশি আবেদন জামায়াত অধ্যুষিত এলাকায়

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের সময় চট্টগ্রামে মোট ভোটার ছিল ৬৩ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৭ জন। ২ জানুয়ারি হালনাগাদ খসড়া তালিকায় তা হয়েছে ৬৫ লাখ ৪৮ হাজার ৯৭১ জন। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চট্টগ্রামে ভোটার হতে ২ লাখ ৫৬ হাজার ৯৩৫ জন নিবন্ধন ফরম পূরণ করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফরম পূরণ হয়েছে বাঁশখালীতে, ২২ হাজার ৯৬৬। এর পর লোহাগাড়ায় ২১ হাজার ২৩৯, আনোয়ারায় ২০ হাজার ২০৬, হাটহাজারীতে ১৯ হাজার ৩৬২, বোয়ালখালীতে ১৮ হাজার ৫২৪, সীতাকুণ্ডে ১৮ হাজার ১৩, পটিয়ায় ১৫ হাজার ৮০, সাতকানিয়ায় ১৪ হাজার ৯৮৫, রাঙ্গুনিয়ায় ১৪ হাজার ৭৭৯, মিরসরাইয়ে ১২ হাজার ৭৮১, সন্দ্বীপে ১০ হাজার ৮০৩, ফটিকছড়িতে ১০ হাজার ৪৫২, রাউজানে ৯ হাজার ৯২১, চন্দনাইশে ৯ হাজার ৮৩২ ও কর্ণফুলীতে ৪ হাজার ৪১৭ জন।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ছয় নির্বাচনী এলাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবেদন পড়েছে ডবলমুরিংয়ে, ৮ হাজার ৮৪৭টি। এ অঞ্চলও জামায়াতের ঘাঁটি। চান্দগাঁও এলাকায় ৬ হাজার ৪২৬, পাহাড়তলীতে ৫ হাজার ১৫৭, পাঁচলাইশে ৫ হাজার ১২৭, বন্দরে ৪ হাজার ৩৪৫ ও কোতোয়ালিতে ৩ হাজার ৬৭৩ জন।

ডবলমুরিং ও পাহাড়তলী নিয়ে চট্টগ্রাম-১০ আসনে মহানগর জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালী প্রার্থী হচ্ছেন। চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে উত্তর জেলা জামায়াতের আমির আলাউদ্দিন সিকদার, চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আনোয়ারুল সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) ইঞ্জিনিয়ার সিরাজুল ইসলাম, চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) থেকে অধ্যাপক মাহমুদুল হাসানকে প্রার্থী ঘোষণা দিয়েছে জামায়াত।

ভোটার ধরতে বিশেষ ক্যাম্প

লোহাগাড়া-সাতকানিয়া আসনে জামায়াতের প্রার্থী মহানগরের আমির শাহজাহান চৌধুরী, যিনি আগেও এমপি হয়েছেন। আসনটি পেতে মরিয়া দলটি। নতুন ভোটার কার্যক্রম তদারকি করেছেন নেতাকর্মীরা। ভোটার বাড়াতে লোহাগাড়ার প্রতিটি ইউনিয়নে ৯ সদস্যের কমিটি করে যুব কমিটি। নিজস্ব ল্যাপটপ ও প্রিন্টার ব্যবহার করে ‘ফ্রি তথ্যসেবা কেন্দ্র’ থেকে ভোটারদের যাবতীয় সহযোগিতা করে। চুনতি ইউনিয়নে সেবা কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত আনোয়ার ইসলাম বলেন, ‘কাগজপত্র সরবরাহ ও অনলাইনে আবেদনের বিষয় অনেকে বুঝতে পারেন না। আমরা তাদের সহযোগিতা করেছি।’ 

ঠিকানা পরিবর্তন বেশি মিরসরাইয়ে

আওয়ামী লীগের ঘাঁটি মিরসরাই বদলে গেছে। এখানে নতুন করে অনেকেই ভোটার হচ্ছেন। জামায়াতের নেতাকর্মীর মধ্যে আগে যারা ভিন্ন জায়গায় ভোটার, তারাই বেশি আবেদন করেছেন। উপজেলা নির্বাচন অফিস জানায়, উপজেলায় ঠিকানা পরিবর্তনের জন্য আবেদন পড়েছে ১ হাজার ৮২টি। ২০২৩ সালে ৬৮১ ও ২০২৪ সালে ছিল ৮১২ জন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মামলা-হামলা থেকে বাঁচতে আওয়ামী লীগ আমলে ভোটার হলেও অনেকে ঠিকানা দিয়েছেন ভিন্ন এলাকায়। এখন তারা ফিরতে চান নিজ এলাকায়। ভোটও দিতে চান পছন্দের প্রার্থীকে। তাদেরই একজন হিগুলী ইউনিয়নের বাসিন্দা মাহফুজুর রহমান জানান, আগে ঢাকার খিলগাঁও এলাকায় ভোটার হলেও এখন তিনি চান গ্রামের ঠিকানায়। জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের বাসিন্দা নুর হোসেন মান্ডা ঢাকার ঠিকানা বদলে মিরসরাইয়ে ভোটারের আবেদন করেছেন।

উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন, ‘ঠিকানা পরিবর্তন প্রতিবারই হয়। এবার আবেদনের হার বেশি।’

আনোয়ারার ১১ ইউনিয়নে সক্রিয়

আনোয়ারায় নতুন ভোটার হতে ২০ হাজার ২০৬ জন আবেদন করেছেন। জানা যায়, এখানে জামায়াত ও তাদের অঙ্গসংগঠন ভোটার তালিকা হালনাগাদে বেশ সক্রিয় ছিল। উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আবু জাফর সালেহ জানান, এবার ১০৮ জন তথ্য সংগ্রহকারী ও ২২ জন সুপারভাইজার বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তবে স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিটি ইউনিয়নে নাগরিক সনদ, জন্মসনদ, ট্রেড লাইসেন্সসহ অন্যান্য সেবা নিতে আসাদের নানাভাবে সহায়তা করেন জামায়াতের যুব কমিটি ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী। ছাত্রশিবির আনোয়ারা শহর শাখার সভাপতি আলী হোসেন বলেন, ১১ ইউনিয়নে কাগজপত্র সরবরাহ ও অনলাইনে আবেদন করতে সহযোগিতা করা হয়েছে। তবে সাংগঠনিকভাবে এ রকম কোনো নির্দেশনা ছিল না।

সীতাকুণ্ডে তথ্য সংগ্রহকারীকে নজরদারি

সীতাকুণ্ডে আগে থেকেই শক্ত জামায়াতের অবস্থান। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারণে নতুন করে স্বপ্ন দেখছে তারা। নতুন ভোটার বাড়াতেও তৎপরতা ছিল দলটির। তথ্য সংগ্রহকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে সারাক্ষণ কার্যক্রম তদারকি করেছেন তারা। সুপারভাইজারের দায়িত্বে থাকা সীতাকুণ্ডের গোলাবারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ কে এম সাজ্জাদ হোসেন সমকালকে বলেন, ‘এলাকায় ভোটারের তথ্য সংগ্রহের সময় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও তদারকি করেছেন। নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন।’

৯ নম্বর ওয়ার্ডে ভোটার তথ্য সংগ্রহকারী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রমে কিছু নেতা ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছেন। ফলে নতুন ভোটারের তথ্য সংগ্রহে বেগ পেতে হয়েছে।’

মুরাদপুর ইউনিয়ন জামায়াতের আমির শহিদুল ইসলাম বলেন, সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের আলোকে প্রতিটি ওয়ার্ডে নতুন ভোটার হওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহে কর্মকর্তাদের সহযোগিতা করা হয়েছে। কাউকে চাপ দেওয়া হয়নি। প্রতিটি ইউনিয়নে টিম কাজ করেছে।

সৈয়দুর ইউনিয়ন জামায়াতের আমির আবদুর রহমান বলেন, জামায়াতের পক্ষ থেকে প্রতিটি ওয়ার্ডে চার-পাঁচজনের টিম তথ্য সংগ্রহকারী কর্মকর্তাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেছে। স্থানীয় জেলেদের ভোটার হতে বিশেষ সহায়তা করা হয়েছে।

সূত্র  সমকাল